বিন্না গাছের ডাল প বিনুনী করে এই দেবতার পুজো করা হয়

পাটাই ঠাকুরের পুজো প্রথম শুরু হয়েছিল অবিভক্ত বাংলায়। বাংলাদেশের টাঙ্গাইলে এই দেবতার পুজো শুরু হয়েছিল। জনশ্রুতি এই যে পাটাই ঠাকুরের পুজো উপলক্ষে একটি পরিবারে এলাহি আয়োজন করা হয়েছিল। পরিবারের কর্ত্রী সকালে উঠে নিজের হাতে রকমারি পদ রান্না করে আলাদা আলাদা পাত্রে সাজিয়ে রেখেছিলেন। পুরোহিত এলে পাটাই ঠাকুরের থানে তাঁর পুজো করা হবে। শাশুড়ি মা রান্না করা পদগুলো উঠোনে এনে রেখে যাচ্ছেন। ওই বাড়িরই এক বৌমার ঠাকুরের জন্যে রান্না করা পদ দেখে ভারী লোভ হয়। শাশুড়িমা যখন এক একটি পদ রেখে বারবার রান্নাঘরে যাচ্ছেন, ওই বাড়ির বৌমা প্রত্যেকটি পদ নিজে একটু একটু করে চেকে দেখছেন। শাশুড়ি মা নজর এড়িয়ে লোভনীয় সব রান্না ঠাকুরের কাছে প্রসাদ হিসেবে পৌঁছনোর আগেই বৌমার স্বাদ নেওয়া হয়ে গেছে। এদিকে সমস্ত খাবার তখন এঁটো হয়ে গেছে। পাঠাই ঠাকুর ভারী ক্ষেপে যায়। বৌমার এমন দুঃসাহস দেখে তাঁকে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন দেবতা। তাঁর লম্বা জিভ প্রসারিত হয়ে বৌমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলে। এমন সময় ঠাকুরের থানের সামনে শাশুড়ি মা এসে উপস্থিত হন। বৌমার এই দুরবস্থা দেখে ভারী কষ্ট হয় তাঁর। সন্তানতুল্য বৌমার খিদে এবং লোভের কথা বুঝতে পেরেও তার মন দুঃখিত থাকে। তবে এই অতিলৌকিক দৃশ্যে শাশুড়ি মা তখন ভীত। বৌমা নিজেও ততক্ষণে তার অন্যায় স্বীকার করে নিয়েছে। শাশুড়ি মা তখন ঠাকুরকে সন্তুষ্ট করার জন্য সমস্ত এঁটো হয়ে যাওয়া খাবার ফেলে দিয়ে নতুন করে সব রান্না করে নিয়ে আসেন। পাটাই ঠাকুর সন্তুষ্ট হয়ে বৌমাকে মুক্তি দেন। বাংলাদেশের টাঙ্গাইলে এমনই একটি জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে।

উত্তরবঙ্গে বর্তমানে এই ঠাকুরের পূজো অবলুপ্ত হয়ে গেছে। আগে অভিমুন্য ঘোষের পূর্বপুরুষদের আদি বাড়ি বাংলাদেশের টাঙ্গাইলে ছিল। তাঁদের বাড়ি থেকে পাটাই ঠাকুরের পুজোর চল শুরু হয়। পাটাই ঠাকুরের পুজো হল বন ও দুর্গার পুজো। স্বাধীনতার পর দেশভাগ হলে অভিরাম ঘোষের পূর্বপুরুষরা বাংলাদেশের টাঙ্গাইল ছেড়ে ভারতবর্ষে চলে আসেন। ওঁরা কোচবিহার জেলার চ্যাংড়াবান্ধায় বসবাস করতে শুরু করেন। এই পরিবার পাটাই ঠাকুরকে ভোলেননি। অভিমন্যু ঘোষ ওরফে অভিরাম ঘোষের ছোট বৌদি বাতাসী ঘোষ নিজের বাড়িতে পাঠাই ঠাকুরের পুজো আবার শুরু করেন।

প্রতিবছর পৌষ মাসের শুক্লপক্ষ তিথিতে পাটাই পুজো করা হতো। ওই অঞ্চলে বিন্না গাছ নামে একটি বিশেষ ধরনের গাছ পাওয়া যেত। এই গাছের শুকনো নরম ডাল নিয়ে তাকে নরম করে মোট তিনটি বিনুনি তৈরি করে পাঠাই ঠাকুরের পুজো করা হতো। পাঠাই ঠাকুরের প্রতিকী এই বিন্না গাছের ছোবার মূর্তিটা বানাতেন ওই ঘোষ পরিবারের কেউ। বাড়ির উঠোন পরিষ্কার করে মাটির বেদী তৈরি করে প্রতীকি ওই বিনুনি দিয়ে তৈরি ঠাকুরকে স্নান করিয়ে চন্দন আর তুলসী দিয়ে বেদীর উপর প্রতিস্থাপন করা হতো। পাটাই ঠাকুরের প্রিয় ফুল গাঁদা ফুল। উঠোনের ওপর থানের একপাশে ছোট্ট পুকুর কেটে সেই পুকুর ভরে দুধ আর জল দেওয়া হত। তার ওপর ঘট বসিয়ে ঠাকুরের পুজো উপলক্ষে রকমারি রান্না করা হতো।

পুজো বলতেই ঠাকুরের নাম করে মন্ত্রপাঠ করা হতো।। “ঘোর পূর্ণিমা চতুর্দশী / পাটাই ঠাকুর দুয়ারে বসি॥” এই ছড়া দিয়েই মন্ত্র পাঠ শুরু হতো। তারপর শাশুড়ি বৌমার জনশ্রুতিটি ব্রতকথার আকারে পাঠ করা হতো পাটাই ঠাকুরের সামনে। পরের দিন ভোরবেলা পাটাই ঠাকুরের মূর্তিটা পাশের কোন পুকুর বা নদীর পাড়ে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হতো। সেই নদী বা পুকুরে স্নান করে বাড়ি ফিরতে হতো পুজো করা পরিবারের কাউকে। তবে এই পুজো বর্তমানে উত্তরবঙ্গের কোথাও আর দেখা যায় না। ২০১২ সালে উত্তরবঙ্গের চ্যাংড়াবান্ধায় পাটাই ঠাকুর পুজো করা এই ঘোষ পরিবারের শেষ বংশধরের মৃত্যু হয়। ফলে ওই বাড়িতে পাটাই ঠাকুরের পুজো বন্ধ হয়ে যায়। ব্যতিক্রমী এই লৌকিক দেবতার পুজো বন্ধ হয়ে গেলেও পাটাই ঠাকুরকে ঘিরে জনশ্রুতি আজও লোকের মুখে শোনা যায়।

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...