পূর্ব বর্ধমানের বীরহাটায় বিরাজ করে আরও এক বড় মা। অবিভক্ত বর্ধমান জেলার প্রাচীন মন্দিরগুলো মধ্যে অন্যতম হল বীরহাটা কালীবাড়ি৷ যদিও এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা কে বা মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল জানা যায়। সুপ্রাচীন কাল থেকেই পুজো হয়ে চলেছে। পুজোর বয়স একশো বছর পেরিয়েছে বহুকাল। জনশ্রুতি রয়েছে, দেবী কালী ডাকাতকালী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন৷ জিটি রোড পাকা করার সময় বাঁকা নদীর তীরবর্তী এলাকার জঙ্গল পরিষ্কার করে মাটি কাটার কাজ চলছিল সেই সময় কালী মায়ের বেদী উদ্ধার হয়।
জনশ্রুতি রয়েছে, যখন জিটি রোডে পিচের আস্তরণ পড়ছিল; সেই সময় বাঁকা নদীর তীরবর্তী এই অঞ্চল ছিল জঙ্গলে ঘেরা। মজুরেরা মাটি কাটতে কাটতে দেবীর বেদী দেখতে পান। শোনা যায়, ম্যালেরিয়া বা মহামারীর প্রাদুর্ভাব হলে মুক্তিলাভের জন্য রক্ষাকালী পুজো করা হত। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাঁশ খড় তালপাতার ছাউনি ঘেরা বেদীটিকে পুনর্নিমান করা হয়। ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করা হয়। এই সময় দেবীর পূজার কাজে নিযুক্ত ছিলেন দক্ষিণ দামোদর অঞ্চলের কোনও এক ঘোষাল পরিবার। জনৈক বংশগোপাল নন্দের অর্থানুকুল্যে ও উপেন্দ্রনাথ রায়ের চেষ্টায় কালক্রমে বাঁশ খড় আর তালপাতার ছাউনি পাকা ঘরে পরিবর্তিত হয়। প্রতি অমাবস্যায় মার পুজো শুরু হয়।
আঠারো শতকে বর্ধমানে বার বার বর্গী হামলা হয়েছে। ক্রমে ক্রমে জনগণ বর্গীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে থাকে। জোট বেঁধে তাঁরা বর্গীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। সেই থেকে এলাকার নাম হয় বীরহাটা। অন্য মতে, বীরাচারী সন্ন্যাসীরা প্রাচীন কালে এই অঞ্চলে আসতেন। তা থেকেই বীরহাটা নামকরণ হয়েছে।
বীরহাটার কালীমন্দিরের মাতৃমূর্তি ব্যতিক্রমী। দেবী যেন আধুনিকা। দুষ্টের সংহার করেন আবার আধুনিকতাকে গ্রহণও করেন। দেবীর চার হাতে খড়্গ, নরমুণ্ডের সঙ্গে রয়েছে স্মার্ট ওয়াচ। দেবীর যে হাতের মুঠোয় ধরা অসুরের ছিন্ন মস্তক, সেই হাতের কব্জিতে বাঁধা স্মার্ট ওয়াচ! অন্য আরেকটি হাতে ঝোলানো ভ্যানিটি ব্যাগ। তাতে থাকে অ্যান্ড্রয়েড ফোন। এ'সব ভক্তদের দান। প্রত্যেকেই দেবীকে মা মনে করেন৷ তাই মাকে স্মার্ট ফোন ও স্মার্ট ওয়াচ দিয়ে গিয়েছেন। সেগুলো মায়ের হাতেই দেওয়া আছে। অনেকে মায়ের ফোনে কল করেন। ফোনের চার্জ যাতে শেষ না-হয়ে যায় সেই জন্য নিয়মিত চার্জ দেওয়া হয়। ভক্তদের বিশ্বাস মাকে ফোন করলে মা উত্তর দেন।
মন্দির থেকে মায়ের নম্বর সংগ্রহ করতে হয়। কেউ নম্বরে ফোন করলে রিং বেজে যাবে। মন্দিরের কেউ ধরবেন না। সাইলেন্ট করে রাখা হয় পুজোর ব্যাঘাত রুখতে। কখনও পুজোর সময়ও ফোন বাজে। বন্ধও হয়ে যায়। ভক্তরা, অন্তত ফোন তো করতে পারলাম। দেবীকে অনেকেই প্রসাধনী সামগ্রীও দেন। শীতের সময়ে ক্রিম, তেল ইত্যাদি দেন। মায়ের গায়ে ক্রিম লাগিয়ে দেওয়া হয়। কেউ বিশ্বাস করে কিছু দিলে সেটা মায়ের কাছে রাখা হয়। এটাই বীরহাটার বড় মা কালী মন্দিরের নিয়ম।
বর্ধমানের কার্জন গেটের কাছেই রয়েছে বীরহাটার এই কালী মন্দির। বীরহাটা ব্রিজের ক্লক টাওয়ার পার করেই কালীবাজার মোড়। মোড়ের ডানদিকেই বীরহাটা কালীবাড়ি অবস্থিত। মন্দিরে দুই বেলা মায়ের নিত্য পুজো করা হয়। প্রতি অমাবস্যায় বা বিশেষ তিথিতে পুজোর সময় প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। কালীপুজোর দিন বিভিন্ন জায়গার মানুষ মায়ের পুজো দেখার জন্য ভিড় করেন। সারারাত ধরে চলে মায়ের পুজো। এককালে পশুবলি দেওয়া হত। পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন চালকুমড়ো বলি হয়৷ বড় মা কালীর ঘট উত্তোলনের শোভাযাত্রা হয়। প্রতি বছর শোভাযাত্রার মাধ্যমে ঘটে জল ভরে নিয়ে যাওয়া হয় মন্দিরে।
শোনা যায়, ১৯২৪ সালে বেশ কিছু ভক্ত, নিজেদের রান্নার চাল থেকে চাল বাঁচিয়ে ভাঁড়ে জমাতে শুরু করেন। সেই চাল বিক্রি করে প্রাথমিক মন্দির তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে বীরহাটা, টাউনহল পাড়া, কালীবাজার, প্রতাপেশ্বর শিবতলা ও মুরাদ মহল্লা, পাঁচ অঞ্চলের মানুষেরা কালীবাড়ি সমিতি গঠন করে। ২০০১ সালে বীরহাটা কালী ট্রাস্ট গঠন করা হয়। তারাই পুজো পরিচালনা করছে। প্রথমে মায়ের মাটির মূর্তিই পূজিত হত। ২০০৪ সালে আট ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট অষ্টধাতুর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বীরহাটা বড় মা কালী মায়ের মন্দিরে মা জগদ্ধাত্রীর পুজোও হয়। এছাড়াও দেবী দুর্গার শ্বেত পাথরের মূর্তি রয়েছে। দেবী দুর্গার নিত্য পুজো হয়। ডাকাতে কালী হিসাবেও দেবীকে অনেকেই অভিহিত করে থাকেন। তবে বর্ধমান শহরের বড়মা নামেই তিনি পরিচিত। এই মূর্তিটি বর্ধমান শহরের সর্ববৃহৎ কালী মূর্তি। এই কারণেই হয়তো দেবীকে বড় মা নামে ডাকা হয়।