কালী কথা: শবশিবা কালী

শবশিবা, দেবী কালিকার পদতলে শব রূপে বিরাজ করেন দেবাদিদেব মহাদেব। দেবীর সঙ্গে থাকেন আরও এক শিব তিনি সপ্রাণ। রক্তবীজের সংহার করতে এসেছিলেন দেবী দুর্গা। রক্ত মাটিতে পরা মাত্রই কাতারে কাতারে রক্তবীজের জন্ম হচ্ছিল। দুর্গা তখন ভয়ঙ্কর কালী রূপ ধারণ করে, রক্তবীজের মাথা কেটে মাটিতে পরার আগেই অসুরের রক্ত পান করতে থাকেন৷ শুরু হয় প্রলয়। শিব হাজির হন এবং দেবীকে থামাতে শুয়ে পড়েন তাঁর পদতলে। মা কালী দেখেন তাঁর পায়ের নিচে স্বয়ং স্বামী, শিব৷ এরপর মা কালীর মারণ যজ্ঞ বন্ধ হয়৷ স্বামীর বুকে পা, তাই জিভ কাটেন দেবী। এই মূর্তিই চিরাচরিত কালী মূর্তি। কিন্তু শবশিবা ব্যতিক্রমী। নবদ্বীপে শবশিবা মূর্তি বা রূপটি প্রায় ছ'শো বছরেরও বেশি সময় ধরে পূজিত হচ্ছে।

কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের বৃহৎ তন্ত্রসার গ্রন্থ রচনা ও দক্ষিণা কালিকার মূর্তি প্রচলনেরও অনেক আগে থেকে শবশিবার পুজো হচ্ছে৷ প্রথমে বিশেষ যন্ত্রে পুজো হত৷ ১৪৯০ নাগাদ তান্ত্রিক পণ্ডিত নবদ্বীপ ব্যাদরাপাড়ায় শবের উপর মহাকাল শিব মূর্তি ফুটিয়ে তুলে শবশিবা মায়ের নামে পুজো শুরু করেন৷ মা কালীর এই বিশেষ রূপে, পরপর দুটি শিব বিরাজ করেন৷ একবারে নিচে শবরূপী শিব আর তার উপরে সপ্রাণ শিব অবস্থান করেন৷ শবশিবা মা নদীয়া রাজ কৃষ্ণচন্দ্রের গুরুদেব চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্যের ইষ্টদেবী৷ এই পুজো দীর্ঘ বছর বন্ধ ছিল। পণ্ডিত বংশের আদিপুরুষ রাজারাম পূর্ববঙ্গ থেকে নদীয়া রাজের আহ্বানে নবদ্বীপে আসেন। পণ্ডিত বাড়ির উৎসবকে নদীয়া রাজ সর্বসাধারণের উৎসব করে তোলেন৷ নবদ্বীপের রাসে ব্যাদড়াপাড়ার শবশিবা মায়ের পুজোর সূচনা হয়৷ নবদ্বীপের দ্বিতীয় শবশিবা কালী পুজো অর্থাৎ আমপুলিয়ার প্রতিমাটি হল মহামহোপাধ্যায় শিতিকন্ঠ বাচস্পতির ইষ্টদেবী।

তান্ত্রিক দেবী প্রতিমার নিচে শব বা মৃত শিব থাকেন। তার উপর জীবিত মহাকাল শিবের সঙ্গে রতিক্রিয়ায় মগ্ন থাকেন দেবী কালী৷ শবশিবা শ্যামবর্ণা নন বরং নীলাভ৷ নবদ্বীপে বিদ্যাসাগর কলেজের কাছে ভূতেশ্বরীর পুজো হয়। এই দেবীও শবশিবা। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের অর্থানুকূল্যে ১৭৫২-৫৬ সালের মধ্যবর্তী কোনও এক সময়ে মহাসাধক শঙ্করনাথ তর্কবাগীশ শক্তিমূর্তি গড়ে রাস পূর্ণিমায় পুজো শুরু করেন। শঙ্করনাথ এলানিয়া কালীর পুজোর পরের বছরই ব্যাদড়াপাড়ার ব্রাহ্মণরা নিজেদের পল্লীতে শবশিবার পুজো শুরু করেন। একই মূর্তির পুজো হয় আমপুলিয়া পাড়ায়। সে হিসাবে নবদ্বীপে রাসের দ্বিতীয় প্রাচীন মূর্তিটি হল শবশিবা মা।

শবশিবা মাতা আদপে কৃষ্ণচন্দ্রের গুরুদেব চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্যের ইষ্টদেবী। এখন যেখানে পুজো হয় সেটি ছিল তাঁর ভিটে। আজ থেকে কমবেশি দেড়'শো বছর আগে তাঁরা এখান থেকে চলে যান। ১৮৭০ সাল নাগাদ পুজোর ভার তুলে নেন অঞ্চলের বর্ধিষ্ণু ব্রাহ্মণেরা। যাঁদের অন্যতম পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য, তার কন্যা ভগবতীদেবী, নসুজীবন ভট্টাচার্য প্রমুখ। পুজো হয়ে ওঠে সর্বজনীন।

দাঁইহাটের রাসেও শবশিবার পুজো হয়। কালিকা পুরাণ মতে, প্রেতবৎ শিবের সঙ্গে কালীর রমন শবশিবার বৈশিষ্ট্য৷ কোচবিহার থেকে আসা রাজবংশী ক্ষত্রিয় তন্ত্রসাধক ভগীরথ সিংহ দাঁইহাটে শবশিবার পুজো শুরু করেন৷ নবদ্বীপের শবশিবা পুজোর সমসাময়িক এখানকার শবশিবা পুজো৷ এখানে মাতৃপ্রতিমা নীলাভ আসমানি রঙের৷ ভাইফোঁটার দিন দাঁইহাটের শবশিবার কাঠামো পুজো হয়।

পূর্ব বর্ধমানের মন্তেশ্বর থানার খান্দাড়া গ্রামে তিনশো বছর ধরে পূজিতা হচ্ছেন শবশিবা। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের দ্বিতীয় মঙ্গলবার থেকে চারদিন যাবৎ শবশিবা মায়ের বিশেষ পুজো হয়। কয়েকদিন ধরে মেলা হয়। এখানে দেবীর পাশে থাকেন সখী জয়া ও বিজয়া৷ জনশ্রুতি রয়েছে, ত্রিবেণী সঙ্গমে পূণ্যস্নান করতে গিয়ে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব পাহাড়ের চূড়ায় শবশিবা দেবীমূর্তি দেখে মুগ্ধ হয়ে পড়েন। তারপর নবদ্বীপের ব্রাহ্মণরা শবশিবা পুজো শুরু করেন৷ নদীয়ারাজরা ছিলেন শাক্ত মতের পৃষ্ঠপোষক৷ রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও তাঁর উত্তরসূরী গিরীশচন্দ্র, বৈষ্ণব বা শৈব মতের বিরোধী ছিলেন না৷ বরং শাক্ত-শৈব-বৈষ্ণবের মহামিলন ঘটেছিল সেখানে।

লক্ষ্ণৌয়ের ঘাসিয়ারি মাণ্ডিতে মা শবশিবা কালীর মন্দির রয়েছে। লক্ষ্ণৌ কালীবাড়ির সেবাইত পরিবারের এক সদস্য এই কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেবাইতরা মুখোপাধ্যায়, বাঙালি ব্রাহ্মণ। বাঙালি রীতিনীতি অনুসারে এখানে কালীপুজো হয়। আদিকালীবাড়ির অনুকরণে পাথরের তৈরি মা শবশিবা কালীমূর্তি বানিয়ে স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয়রা একে গুরুপদ কালীবাড়ি বলে। সম্ভবত প্রতিষ্ঠাতার নাম অনুসারে এই নামের সৃষ্টি।

বারানসীর বাঙালিটোলার দেবপুরা অঞ্চলে রয়েছে শবশিবা মন্দির। নদীয়ারাজ মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ধর্মগুরু শ্রী চন্দ্রশেখর শর্মা ছিলেন তন্ত্র সাধক। আনুমানিক ২৩৫ বছর আগে, ১৭৮৯ সালে এই মন্দির স্থাপন করেছিলেন তিনি। কৃষ্ণনগর রাজপুরোহিত তন্ত্রগুরু চন্দ্রশেখর শর্মা; কালীমন্দির ও কালীমূর্তি, দুটিরই প্রতিষ্ঠা করেন। মূর্তিটি দক্ষিণ দিকে স্থাপন করা হয়। দেবী পঞ্চমুণ্ডের আসানে উপবিষ্ট হন। গৌরী শিবলিঙ্গ মূর্তির উত্তরে অবস্থিত এবং শ্রী মহাকাল ভৈরবও অবস্থান করেন দেবীর সঙ্গে।

পঞ্চমুণ্ডির আসনে স্থাপিত এখানকার বিগ্ৰহটি অভিনব ও অনন্য। উত্তর অভিমুখে শিবলিঙ্গ এবং দক্ষিণ অভিমুখে অর্থাৎ সামনের দিকে দেবী মূর্তিটি খোদিত আছে। বিগ্ৰহটি গৌরীপট্টের উপরে বিদ্যমান।

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...