পুরী তখনও নীলাচল হয়নি।পরিচিত ছিল ‘মালবদেশ’ নামে। মালবরাজ সূর্য বংশের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন। এক সন্ন্যাসীর থেকে রাজা হঠাৎ জানতে পারলেন বিষ্ণুর আর এক রূপের কথা। এই নব রূপের নাম ‘নীলমাধব’। কিন্তু নীলমাধবকে কোথায় পাওয়া যাবে, বিগ্রহের অবয়ব কী সে সব তিনি কিছুই জানতেন না। রণে- বনে- জলে- জঙ্গলে নীলমাধবের সন্ধান করতে অনুচর নিয়োগ করলেন।
সেই দলে ছিল ‘বিদ্যাপতি’ নামে এক পুরোহিত। সকলে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল। কেবল বিদ্যাপতি ছাড়া। তিনি ফিরলেন না। ঘন জঙ্গলের মধ্যে পথ হারিয়ে সঙ্গীদের থেকে বিচ্ছিন্ন। দিকভ্রষ্ট, বিপদগ্রস্থ বিদ্যাপতিকে জঙ্গলে উদ্ধার করলেন এক শবরকন্যা। তিনি শবররাজ বিশ্ববসুর মেয়ে ললিতা। সেই সূত্রেই শবর রাজের গৃহে আশ্রয় পেলেন তিনি। কিছু কাল পর ললিতার সঙ্গেই বিয়ে হয় বিদ্যাপতির। অরণ্যের ছায়ায় এক রাজ পুরোহিত আর শবর কন্যার সংসার। রাজসভার কোলাহল থেকে অনেক দূরে মন্দাক্রান্তা লয়ে জীবন। একদিন শবর রাজের কাছ থেকে বিদ্যাপতি একদিন জানতে পারলেন নীলমাধবের বৃত্তান্ত। জানতে পারলেন, যে নীল মাধবের খোঁজে পথ হারিয়ে এই অরণ্য জীবন তাঁর অস্তিত্ব কোনও মিথ না, বাস্তব সত্য। দেবতা আছেন। জঙ্গলের গহীনে নীল পর্বতে নীলমাধবের বিগ্রহ। বিশ্ববসু সেখানেই রোজ নীলমাধবের পূজা দিতে যান। নীলমাধবের কথা জানতে পেরে শবররাজ বিশ্ববসুর কাছে অনুরোধ করলেন নীলমাধবের দর্শনের জন্য। সহজে রাজী হননি তিনি। শেষে নাছোড়বান্দা অনুরোধে শেষতক নীলমাধবের দর্শন করান। সেই গুহা মন্দিরেই বিদ্যাপতি প্রথম পুজো করেন নীলমাধবের।
বিদ্যাপতি বার্তা পাঠান রাজা ইন্দ্র্যদ্যুম্নের কাছে। রাজা বিস্ময়ে আনন্দে অস্থির! তিনি নীল মাধবকে পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। এখন আকস্মিক এমন সংবাদে রাজা উচ্ছ্বসিত! অরণ্য থেকে নীলমাধবকে আনার জন্য রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন গুহায় উপস্থিত হলেন দেবমূর্তি অন্তর্হিত। দেব মূর্তির অদর্শনে তিনি আমৃত্যু অনশন ব্রত গ্রহণ করলেন। কিন্তু এখানেই আসল চমক। এমন সময় আবার দৈববাণী। ইথার তরঙ্গে ভেসে আশা কন্ঠ রাজাকে দারুমূর্তি নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিল। সমুদ্রের জলে যে কাষ্ঠ খন্ড ভেসেআসবে তাই দিয়েই যেন তৈরি হয় বিগ্রহের মূর্তি। একদিন সত্যিই সত্যিই এক অদ্ভুত কান্ড ভেসে এল সমুদ্রের স্রোতে। সে কান্ডের গায়ে বিষ্ণু দেবের শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম। এই কান্ড দিয়েই তৈরি হবে দেব দেহ।
মহাসমারোহে শুরু হলো বিগ্রহ তৈরির কাজ। কিন্তু কাজ থমকে যায় বারবার বারবার। ছেনি, হাতুড়ি সব ব্যর্থ। কেউ সেই কাঠের গায়ে আঁচড় বসাতে পারে না। ফিরে যায় সব শিল্পী।
বিগ্রহ তৈরির কাজ তখন এক প্রকার দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেষে দারু শিল্পীর রূপ ধরে স্বয়ং নারায়ণ এলেন রাজার দরবারে। অসহায়, অনন্যপায় রাজা ভরসা করলেন অচেনা শিল্পীর ওপর। কিন্তু সেই শিল্পী অদ্ভুত এক শর্ত দিলেন রাজাকে। তিনি বললেন, , তিনিই গড়বেন নীলমাধবের বিগ্রহ। কিন্তু তিন সপ্তাহ বা ২১ দিনের পূর্বে কেউ তাঁর কাষ্ঠমূর্তি নির্মাণ দেখতে পারবে না। সম্মত হলেন রাজা ইন্দ্রদুম্ন। কাজ আরম্ভ করলেন দারুশিল্পী। রাজার তৈরি মন্দিরে দ্বার রুদ্ধ করে চলল মূর্তি গড়ার কাজ। রাজার কড়া হুকুম কেউ যেন শিল্পীকে বিরক্ত না করে। কিন্তু রানী গুণ্ডিচার ভারী কৌতূহল। অচেনা শিল্পী। কী কাজ করছে, কেমন কাজ করছে তিনি দেখতে চান। একদিন ভেতর থেকে সাড়াশব্দ না পেয়ে রাণী দরজা খুলে ঢুকে পড়লেন ঘরের ভিতর। কিন্তু কোথায় শিল্পী! কোথাও কেউ নেই! তিনটি অর্ধসমাপ্ত দারু মূর্তি! মূর্তির দেহ আছে, কিন্তু হস্ত- পদ কিছুই প্রস্তুত হয়নি! অতিরিক্ত কৌতূহলেই যে শিল্পী বিদায় নিলেন বিলক্ষণ বুঝতে পারলেন রাজা- রাণী। শর্ত লঙ্ঘনের কারনেই বিগ্রহ পূর্ণতা পেল না। রাজ্য জুড়ে উথালপাতাল। রাজা অস্থির।
এই যখন অবস্থা তখন একদিন রাজা ইন্দ্রদুম্নের স্বপ্নে উপস্থিত হলেন নীলমাধব। জানালেন এই ঘটনা পূর্ব নির্ধারিত। এমনটাই হবার কথা ছিল। রাজা-রাণী নিমিত্ত মাত্র। এই রূপেই পূজিত হবেন তিনি। ইন্দ্রদুম্নের পূজিত নীলমাধব-ই দারুব্রহ্ম জগন্নাথ। নীলমাধবের নামেই ‘নীলাচল’ নামে পুরীর পরিচিতি।
আরও একটি কাহিনী প্রচলিত আগে দারুব্রহ্ম জগন্নাথকে নিয়ে।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, শ্রীকৃষ্ণ রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে দেখা দেন। তিনি রাজাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, পুরীর সমুদ্রতটে ভেসে আসা নির্দিষ্ট কাষ্ঠখণ্ড দিয়েই বিষ্ণুদেবের মূর্তি তৈরি করতে হবে। রাজা যখন বিগ্রহ নির্মাণের জন্য শিল্পীর সন্ধান করছেন তখন অনন্ত মহারানা নামে এক লোলচর্ম বৃদ্ধ আসেন তাঁর কাছে। তিনি বলেন তিনিই মূর্তি তৈরি করবেন। কিন্তু শর্ত দেন কাজের
সময় কেউ যেন তাঁকে প্রশ্ন না করে, বাধা না আসে। কেউ যেন দেখতে না চায়। সব শর্ত মেনে নেন রাজা। রুদ্ধ দ্বার কক্ষে চলে কাষ্ঠ মূর্তি তৈরির কাজ। প্রতিদিন ভিতরথেকে কাঠ খোদাইয়ের শব্দ ভেসে আসত। রাজা নিশ্চিন্ত থাকতেন।
কিন্তু একদিন কক্ষের ভিতর থেকে কোনও সাড়া পেলেন না রাজা। নিঃস্তব্ধ বন্ধ দরজার ওপার। বেজায় সংশয়। ভিতরের পরিস্থিতি কী জানার জন্য রাণী আর নিজের কৌতূহল সংবরণ করতে পারলেন না। দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন। দেখেন দেবমূর্তি অসমাপ্ত। দারুশিল্পীও নিরুদ্দেশ। শিল্পী ছিলেন দেব কারিগর বিশ্বকর্মা। নীল মাধবের হস্তপদ নির্মিত হয়নি বলে বিষাদে ডুবে গেলেন রাজা। শিল্পীর স্বাধীনতায় কাজে বাধাদানের জন্য অনুতাপ করতে থাকলেন। তখন দেবর্ষি নারদ রাজাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, এই অর্ধসমাপ্ত মূর্তিই পরমেশ্বরের এক স্বীকৃত স্বরূপ। অসম্পূর্ণতাও ঈশ্বরের স্বরূপ। অসম্পূর্ণতার মধ্যে লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণতার বীজ। তাই সৃষ্টি গতিময়। ঈশ্বর সেই স্বরূপউদঘাটিত করতে চেয়েছিলেন। তাই এই রূপেই তাঁর আবির্ভাব। এভাবেই পুরী হয়ে উঠল শ্রীক্ষেত্র। প্রভু জগন্নাথের লীলাভূমি। এটি চারধামের অন্যতম।
ওড়িশার রাজকাহিনির প্রামাণিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় ‘মাদলা পাঁজি’ থেকে (তালপাতার পুঁথি)। তাছাড়া মৈহর শিলা লেখ, নাগপুর শিলালেখ ও পূজারি পালী শিলালেখ থেকেও বহু ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া গিয়েছে।
কোনও কোনও গবেষক, জগন্নাথকে মূলত আদিবাসী দেবতা মনে করেন। ওড়িশার আদিম আদিবাসী সরভরা ছিল বৃক্ষ-উপাসক। তারা তাদের দেবতাকে বলত “জগনাত”। সম্ভবত, এই শব্দটি থেকে “জগন্নাথ” শব্দটি এসেছে।
পুরাণে আছে, বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতার কাঠের স্তম্ভ ভেঙে বেরিয়েছিলেন। তাই জগন্নাথকে দারুব্রহ্ম রূপে নৃসিংহ স্তোত্র পাঠ করে পুজো করা হয়। জগন্নাথকে এককভাবে পুজো করার সময় বলা হয় “দধিবামন”। বার্ষিক রথযাত্রার সময়ও জগন্নাথকে বামন রূপে পূজিত হন। ষোড়শ শতাব্দীতে তুলসীদাস পুরীতে এসে জগন্নাথকে রঘুনাথ (রাম) রূপে পূজা করেছিলেন।
চৈতন্যদেব মহাপ্রভুর সময় থেকে জগন্নাথকে কৃষ্ণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। রথযাত্রা উৎসবের সময় বলভদ্র, জগন্নাথদেব ও সুভদ্রার বিগ্রহ মূল মন্দিরের গভর্গৃহ থেকে বের করে আনা হয়। এই বিগ্রহের চোখ দুটো বড় বড় ও গোলাকার। হাত অসম্পূর্ণ এবং বিগ্রহের কোন পা দেখা যায় না। যে বছর জোড়া আষাঢ় পড়ে সেই বছরটি শ্রী জগন্নাথ , বলভদ্র ও মা সুভদ্রার নব-কলেবর হয় । অর্থাৎ নতুন দারুদেহ নির্মাণ করা হয় তাঁদের।