শোনা যায় তিনি নাকি সাক্ষাৎকার দিতে বসলে, সেটা গল্পের আসরে পরিবর্তন হয়ে যায়। সেখানে তিনি কখনই মেপে ঝুপে কথা বলতে ভালোবাসেন না। মন খুলে কথা বলাটাই বেশী পছন্দ তাঁর। এত বছরের সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা একে একে নিজের ঝুলতে ভরছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা পরাণ বন্ধ্যোপাধ্যায়।
তিনি সাক্ষাৎকারে সেই ঝুলি থেকে সমস্ত কথা একেবারে উজাড় করে মন ভরিয়ে দেন সকল শ্রোতাদের।
এবার এক সংবাদমাধ্যমে এমনই এক সাক্ষাৎকার দিতে বসলেন তিনি। প্রধান শ্যুটিং-এর সময় জঙ্গলে লেপর্ড দেখার অভজ্ঞতা থেকে শুরু করে ছোটবেলার ক্রিসমাসের গল্পই শোনালেন পরাণ বন্ধ্যোপাধ্যায়।
নিজের ভঙ্গিতে শুরু করলেন তাঁর গল্প। উত্তরবঙ্গে একটা লম্বা শ্যুটিং চলছিল। সেখানে তাঁরা আড়াইশো জন মিলে একটা রিসর্টে থাকছিলেন। দারুন মজায় কাটছিল সেই পর্ব কিন্তু তাঁর মধ্যেই একটা অন্য অভিজ্ঞতার শিকার হলেন পরাণ বন্ধ্যোপাধ্যায় সহ সুজন ও বিশ্বনাথ।
তাঁদের হোটেল থেকে শ্যুটিং স্পটে পৌঁছাতে ৪০ মিনিটের মতন সময় লাগত। সেই রাস্তায় ৩টে গভীর জঙ্গল পড়ত। এতটাই গভীর যে গাছের ফাঁক দিয়ে রোদের রশ্মি ঢুকছে, এততাই আলো ঢোকে জঙ্গলের ভেতর। শ্যুটিং করে তাঁরা যখন ফিরত তখন অন্ধকারে ঘেরা সেই জঙ্গল।
ঠিক এরকমই একদিন গাড়ি করে ফিরছিলেন পরাণ বন্ধ্যোপাধ্যায়, সুজন ও বিশ্বনাথ। হঠাৎ তাঁদের নেপালি ড্রাইভারটি ডানদিকে চেপে গিয়ে চা বাগানের পাশে এসে গাড়ি থামিয়ে আস্তে আস্তে করে ব্যাক করতে শুরু করল। এরপর একটা জায়গায় থেমে গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে দিল, এবার পরাণ বন্ধ্যোপাধ্যায়কে বললেন, “স্যার ডানদিকে দেখুন, লেপার্ড….।' ভয়ে ধীরে ধীরে দেখে দুটো জ্বলন্ত চোখ। তাঁদের গাড়ির ঠিক ৬ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে।
তিনি বলতে লাগলেন যে সেই নেপালি ড্রাইভারটি তাড়াতাড়ি কাঁচ নামিয়ে ছবি তুলতে যেতেই তাঁকে বকাবকি করে থামিয়ে দিলেন পরাণ। চুপ করে বসে সবাই। এরপর দেখা গেল লেপর্ডের দুটো বাচ্চা লাফিয়ে আসতেই চিতাবাঘটা ধীরে ধীরে চলে গেল। পরাণ বন্ধ্যোপাধ্যায়ের কথায় সারা জীবনে এই অভিজ্ঞতাটা একেবারেই ভোলবার নয়।
এরপর আসেন অন্য গল্পে। এখনকার দিনে ক্রিসমাস মানেই আলো দিয়ে সাজানো পার্কস্ট্রিট। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখা যায় সান্টাক্লজের টুপি আর ক্রিসমাস ট্রি। কিন্তু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটবেলাতেও কি এইরকম ভাবে ক্রিসমাস পালন করা হত? এই বিষয়ে তিনি বললেন যে ছোটবেলায় তাঁর কখনই মনে হয়নি, ক্রিসমাস আলাদা করে উদযাপন করতে হবে। তাঁর কখনই আগ্রহ জন্মায়নি। তবে, বড়দিন আসলেই তাঁর নাকে নাকি একটা গন্ধ আসে। নলেন গুড়ের গন্ধ। সেটা পেলেই খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েন তিনি। ছোট থেকেই নলেন গুড়ের সাথে একটা আলাদা ধরণের সম্পর্ক রয়েছে তাঁর। সেই সময় গাছ থেকে পাড়ার পর যখন খেঁজুরগুড় জাল দেওয়া হত, তখন তিনি ও তাঁর বন্ধুরা নাকি কলাপাতা নিয়ে গিয়ে ‘ভিখারি’র মতন দাঁড়িয়ে থাকতেন।
খেজুর গাছের ডাল দিয়ে গুড় পাক দেওয়া হত। অনেকক্ষণ জ্বাল দেওয়ার পর তাঁদের সেই কলাপাতার ওপর ধরত আর ঝোড়ে পড়ত। সেই রসে পাতার রঙ সবুজ থেকে হলুদে পরিবর্তন হয়ে যেত ধীরে ধীরে। এরপর ঠাণ্ডা হতেই চেটে চেটে খেতে শুরু করতেন তাঁরা। এখন শহরে আসলেও বছর বছর যতই বড়দিন হোক না কেন তাঁর সেই স্মৃতিকে কখনও ভুলতে পারবেন না তিনি।
আগামীকাল মুক্তি পেতে চলেছে ‘প্রধান’। সেখানে তিনি একজন শিক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছেন তাঁরই ভক্ত, অনির্বাণ চক্রবর্তী। এই ছবিতে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাবে তাঁকে। পর্দায় দুশমানী কিত্নু ব্যক্তিগত জীবনে পরাণ ও অনির্বাণের সম্পর্ক কেমন?
এই বিষয়ে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন যে 'এই রাজ্যে এখন এমন কোনও মানুষ নেই যে 'একেনবাবু'-কে ভালবাসে না। তিনিও এই রাজ্যের মধ্যে রয়েছেন। তবে, অনির্বাণের সন্ধান এর আগেই পেয়েছিলেন তিনি। প্রথমবার যখন অনির্বাণকে দেখেছিলেন তিনি, তাঁকে দেখে চিন্তেই পারেননি অনির্বাণ। তখনই বুঝে গিয়েছিলেন ‘ও মোটেই গজিয়ে ওঠেননি। এর অনেক মূল্যবান পথ চলা রয়েছে।‘ পরে জানতে পারেন অনির্বাণ থিয়েটারের ছেলে। ‘মঞ্চ কাঁপানো, মঞ্চকে ভালোবাসা ছেলে’। তাই ওকে ভালো না বেসে থাকতে পারেন না পরাণ। বাকি সবার মতো, তিনি ওনাকে ভীষণ ভালবাসে।
২২ ডিসেম্বর অর্থাৎ আগামীকাল বড়পর্দায় মুক্তি পাবে 'প্রধান'। আগেই জানা গিয়েছে যে এই ছবির হাত ধরেই বড়পর্দায় পা রাখছেন ধারাবাহিকের অভিনেত্রী সৌমিতৃষা কুণ্ডু। তিনি ছাড়া মুখ্যচরিত্রে অভিনয় করেছেন দেব। এছাড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যাবে সোহম চক্রবর্তী, মমতা শঙ্কর, কাঞ্চন মল্লিক, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ বসু সহ বহু অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। ছবির শ্যুটিং হয়েছে উত্তরবঙ্গ ও কলকাতায় শহরে। ছবি মুক্তি নিয়ে উত্তেজিত গোটা দর্শক।